fbpx
ঘরে ঘরে যখন ফ্রিল্যান্সার

ঘরে ঘরে যখন ফ্রিল্যান্সার

গত পরশু একটা খবর পড়লাম, দেশের উত্তরাঞ্চলে এক জেলায় (জেলার নাম নিচ্ছি না), প্রায় প্রতি ঘরে ঘরে ইমো হ্যাকার। গোয়েন্দা পুলিশ এই পর্যন্ত প্রায় ২০০ জনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের সংখ্যা এত বেশি যে, পুলিশও হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। এক বাড়ীতে একাধিক হ্যাকারও আছে। তারা মূলত প্রবাসীদের টার্গেট করে, নারি কণ্ঠে তাদের প্রলুদ্ধ করে। এর পরে ইমো একাউন্ট হ্যাক করে, টাকা দাবী করে। এই কাজ করে নাকি অনেকে ভাল সম্পদ করে ফেলেছে। তারা নাকি এলাকায় নিজেদের ফ্রিল্যান্সার দাবী করে।
গত জুম্মার আগের জুম্মায়, আমাদের মসজিদে একজন আলেম খুতবা দিলেন। পুরো খুতবাটা মোবাইলে রেকর্ড করা হয়েছে। বুঝলাম ইউটীউব এবং ফেসবুকে সেটা আপলোড হবে। বুঝতেই পারছেন, ভাল সাবস্ক্রাইবার থাকার কারনে, এড থেকে তার ভাল একটা ইনকাম হবে। এই ধরনের ভিডিও পাবলিক খুব পছন্দ করে। ফলে ইনকামও ভাল। এক হিসাবে সেই ইমাম সাহেবও একজন ফ্রিল্যান্সার। শুনেছি অনেক মসজিদের ইমাম হুজুরেরা, খুৎবার পরে, মুসল্লিদের তার ইউটীউব চ্যানেল, সাবস্ক্রাইব করতে বলে। সে হিসাবে আলেম সম্প্রদায়ও, অনলাইন ফ্রিল্যান্সার হয়ে যাচ্ছে। ধর্ম প্রচারও হচ্ছে, সাথে আবার ইনাকামও। এটা এক হিসাবে ভালই বলা চলে।
 
ভিড় এড়াতে আমি ATM থেকে সাধারণত রাতে টাকা তুলি। আমার ATM গার্ড ভাইকে দেখি, সারাক্ষণ মোবাইলে গেম খেলতে। তার সাথে আমার ভাল খাতির। একদিন জিজ্ঞেস করলাম ভাই, এই গেম খেলে কেন সময় নষ্ট করেন? উত্তরে যা বললেন, সেটা আমি মোটেও আশা করিনি। তিনি বললেন, তিনি গেম খেলে পয়েন্ট জমিয়ে, তার প্রফাইল ভারি করেন। এর পরে সেটা ভাল দামে বিক্রি করে দেন। তার বর্তমান প্রোফাইল নাকি, ইতিমধ্যে সাড়ে নয় হাজার টাকা দাম হয়েছে। ১৫ হাজার হলে তিনি ছেড়ে দেবেন। এটা শুনে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। এ কোন জামানায় আছি :O এক হিসাবে তিনিও কিন্তু অনলাইন ফ্রিল্যান্সার।
জানেন কিনা জানি না, আমাদের ঘরের মা বোনেরাও ফ্রিল্যান্সার হয়ে যাচ্ছে। এরা মূলত প্রবাসি ভাইয়েদের টার্গেট করে। বিকাশে অগ্রিম টাকা নিয়ে, মিনিট বা ঘণ্টা চুক্তিতে, তারা নাকি ভিডিও চ্যাট করে। ভিডিও চ্যাটে কি করে, সেদিকে আমি গেলাম না। এটা নাকি খুব রমরমা ব্যাবসা এখন। এভাবে মাসে লাখ টাকা ইনকাম করে, এমন বোনেরাও নাকি আছে। যার যত সুন্দর ফিগার আর চেহারা, তার ইনকাম তত বেশি। টিকটকের প্রসারের ফলে, এই ব্যাবসাটা এখন খুব রমরমা। প্রবাসি ভাইদের টার্গেট করে, টীকটকে তারা আকর্ষণীয় ভিডিও ছাড়ে, আর ইনবক্সে আসতে বলে। এর পরে চ্যাটীং এর মাধ্যমে, বাকী কাজ ইমো বা এই ধরনের এপসে সম্পন্ন করা হয়। সেই হিসাবে, এই আপুরাও কিন্তু ফ্রিল্যান্সার, কারন তারা কিন্তু, অনলাইনের মাধ্যমেই ইনকাম করেন।
করোনার আগে ঢাকায় গিয়েছিলাম। স্মার্টফোন না থাকাতে, চুক্তিতে এক পাঠাও রাইডারের মাধ্যমে মিরপুরের দিকে যাচ্ছিলাম। বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করতে করতে যখন জানলেন, আমি ফ্রিল্যান্সার, তখন তিনি নিজেকেও ফ্রিল্যান্সার হিসাবে দাবী করলেন। আসলে আমার মতে এক হিসাবে এটা ঠিক আছে, কারন তিনি স্বাধীনভাবে এপস এর ম্যাধমে ইনকাম করেন। বিকাশের প্রতারক নাহিদেরাও কিন্তু এক হিসাবে ফ্রিল্যান্সার, যদিও তারা প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের টাকা মেরে খায়। নাহিদের সাথে কথা বলার খুব ইচ্ছা ছিল, এই জন্য গতমাসে বিকাশ একাউন্ট খুলেছি। কিন্তু আফসোস সে আমারে গোনায় ধরে না। এখনো কল দিল না। একাউন্টে মাত্র ২৪৫ টাকা আছে এই জন্য মনে হয় :'( নাহিদ ভাই এই পোষ্ট আপনার চোখে পড়লে, প্লিজ আমাকে কল দিন 🙂 আমি আপনার অনেক বড় ফ্যান 😀
 
কিছু দিন আগে DSD গ্রুপে, একজন খুব আফসোস করে বলছিল, তার পাশের রুমে কিছু স্টুডেন্ট আছে। তাদের চিৎকার চেচামেচির কারনে, সে ঠিকমত ঘুমাতে পারে না। আবার তাদের কিছু বলতেও পারছে না, যদি সমস্যা করে। করোনার কারনে পড়াশোনা বন্ধ, তাই এই অবসর সময়ে, তারা বিকাশ প্রতারনা শিখে নিয়েছে। এটা করে, সাধারণ মানুষের টাকা মেরে খায়। যখন তাদের একাউন্টে, প্রতারণার টাকা ঢোকে, তখন সবাই মিলে চিৎকার করে, আবার মাঝে মাঝে নাকি পার্টিও করে। যেমনটা আমরা ফ্রিল্যান্সারেরা করি। এক হিসাবে তারাও কিন্তু অনালাইন ফ্রিল্যান্সার।
করোনার সময়ে, যখন প্রাইভেট পড়ানোতে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তখন এক শিক্ষক জুমের মাধ্যমে স্টুডেন্টদের ক্লাশ নেয়া শুরু করে। পেমেন্ট বিকাশে অগ্রিম নিয়ে নিত। ভালই তার ইনকাম ছিল। সে যে নিজের অজান্তেই, ফ্রিল্যান্সার হয়ে গেছে, সেই শিক্ষক মনে হয় জানেই না। এভাবে যদি লিখতে থাকি, তবে দেখা যাবে, দেশের এক বিরাট জনগোষ্ঠী অনলাইন ফ্রিল্যান্সার হয়ে গেছে। সরকারের উপরের মহলের ইচ্ছা ছিল, দেশের মাঠ ঘাট ফ্রিল্যান্সার দিয়ে ভরিয়ে দিতে। সেটা বাস্তবায়ন হওয়াতে তারা নিশ্চয়ই এখন আনন্দে ড্যান্স করছে। কাজেই আমরা যারা, প্রকৃত অনলাইন ফ্রিল্যন্সার হিসাবে, নিজেদের নিয়ে গর্ব করতাম, তাদের দিন শেষ হতে চলল :'(
 
আমাদের এলাকার যে দোকান থেকে নিয়মিত মোবাইল রিচার্জ করি, প্রায় দেখি দোকানের সামনে ইয়াং ছেলেদের ভিড়। একদিন আগ্রহ নিয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম এত ভিড় কেন? উত্তরে বলল, এরা নাকি সবাই মোবাইলে IPL বেটিং করে। এছাড়া আরও নাকি অনেক বেটিং এপস আছে, সেগুলোতেও টাকা লাগায়। অনেকেই নাকি এসব করে, ভাল ইনকাম করছে। আলাপ করতে করতেই দেখলাম, একজন আমার সামনেই ৯ হাজার টাকা উঠালো। এক হিসাবে এরাও নিজেদের অজান্তে অনলাইন ফ্রিল্যান্সার হয়ে গেছে। দেশের মুখ উজ্জল করার জন্য ওদেরকে স্যালুট জানাই >:(
অনলাইন এখন আমাদের জীবনে এমন ভাবে জড়ীয়ে গেছে যে, চাইলেও আমরা এড়াতে পারি না। আমার নিজের একটা ঘটনা দ্বারা সেটা বুঝতে পারবেন। আমার এক খালার ফ্যামিলি এসেছে, বিয়ের ব্যাপারে আমার পরামর্শ নিতে। ছেলে অস্ট্রেলিয়াতে PhD করছে। আমার খালার ফ্যামিলির এটা শুনে সবাই রাজি। তারা সিভি চেক করে, খোজ নিয়ে দেখলাম, সে অনলাইনে PhD করছে, অনলাইনে গত আড়াই বছর ধরে ক্লাশ করছে। স্কলারশিপের টাকা নাকি অনলাইনেই পায়। যদিও সে এখনো অস্ট্রেলিয়াতে যায় নাই। আদৌ যেতে পারবে কিনা সন্দেহ। কাজেই এক হিসাবে বলা যায় সেও ফ্রিল্যান্সার। ছেলে পক্ষ লোভ দেখাচ্ছে, বউকে সাথে নিয়ে একেবারে অস্ট্রেলিয়াতে যাবে 😃 আমার আসলে বলার তেমন কিছু ছিল না।
 
কাজেই আমি বলব বিয়ের সময়, ছেলে ফ্রিল্যান্সিং করে, ভাল ইনকাম এসব কথায় গলে যাবেন না। ভাল করে খোজ নিয়ে দেখেন, সে উপরের ফ্রিল্যান্সারদের মত ভ্যাজাল ফ্রিল্যান্সিং করে কিনা। না হলে নিচের ঘটনার মত ঘটনা ঘটতে পারে।
 
একটা বিয়ের আলোচনা চলছে।
পাত্রীর বাবাঃ তা বাবা শুনলাম, তুমি নাকি USA থাকো?
পাত্র : আংকেল, আপনি ঠিকই শুনেছেন। আমি দীর্ঘদিন থেকে USA থাকি (Uttara Sector Agaro উত্তরা সেক্টর ১১)
পাত্রীর বাবাঃ বাবা তুমি বর্তমানে ওখানে কি করছো?
পাত্র: আংকেল বর্তমানে আমি সেখানে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে PhD করছি।
Pizza Home Delivery পিজ্জা হোম ডেলিভারি (PhD)…
পাত্রীর বাবাঃ মাশাল্লাহ, শুনে খুব ভাল লাগল। আমরা সবাই রাজি 🙂
 
পরিশেষে একটা ঘটনা দিয়ে পোষ্টের ইতি টানব। এক মেসের বুয়া রান্না করতে আসছে না প্রায় ৩/৪ দিন হয়ে গেল। নতুন স্মার্টফোন কেনার পর থেকেই এই সমস্যা। সবার খাবারের সমস্যা হচ্ছে। বুয়াকে ফোন দিলেও ধরে না। পরে সরাসরি দেখা করার পরে, বুয়া বলল, এই মাসের পর থেকে, সে আর থাকতে পারবে না। কি একটা এপসের মাধ্যমে সে নাকি ইনকাম করবে। ইনকাম নাকি ভালই হবে। তাই কি দরকার মেসে বুয়াগিরি করার, যেখানে ঘরে বসেই ভাল ইনকাম করা যায়। তাই আসুন সবাই আমাদের এই নতুন ফ্রিল্যান্সার বুয়াকে, স্যালুট জানাই।
ধন্যবাদ!
নোটঃ পোস্টটি গোলাম কামরুজ্জামান ভাইয়ের ব্লগ থেকে নেওয়া।